আওয়ামী লীগের পর বিএনপির নেতাকর্মীরাও কেন দেশ ছাড়ছেন?
তৃণমূলের হতাশা, ক্ষমতার রাজনীতি ও ভবিষ্যতের সংকেত
লেখক: কাজী আবির আসলাম
DhakaNewsBD24 |
প্রকাশ :২৮ অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশের দেশত্যাগের পর বিএনপির কিছু নেতাকর্মীও কেন দেশ ছাড়ার কথা ভাবছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বর্তমান পরিস্থিতির পাশাপাশি ফিরে তাকাতে হবে গত দুই দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে। একই সঙ্গে বুঝতে হবে, ক্ষমতার রাজনীতিতে তৃণমূলের ত্যাগ ও প্রত্যাশার মূল্য কতটুকু।
আওয়ামী লীগের উত্থান, দীর্ঘ শাসন ও পতন
২০০৭ সালের এক-এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনীতি নতুন মোড় নেয়। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে এবং দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর দেশ পরিচালনা করে। এই সময়ে দলটির সাংগঠনিক বিস্তার ঘটে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে দলটির একটি শক্তিশালী সমর্থকগোষ্ঠী ও সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি হয়।
তবে দীর্ঘ শাসনামলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে। ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। এসব অভিযোগ ও বিতর্কের পাশাপাশি নির্বাচনব্যবস্থা, রাজনৈতিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে অসন্তোষ বাড়তে থাকে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটায়। শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ করেন।
এরপর আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী আত্মগোপনে চলে যান। কেউ কেউ গ্রেপ্তার, মামলা, রাজনৈতিক প্রতিশোধের আশঙ্কা কিংবা নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশ ছেড়েছেন বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে সবার পরিস্থিতি এক নয়। কারও বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, আবার কেউ রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।
এই বাস্তবতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা কোনো দলের পতন শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটায় না; তার প্রভাব পড়ে দলের কর্মী, সমর্থক এবং পুরো রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর।
এবার বিএনপির পালা: ত্যাগীদের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হচ্ছে?
বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। প্রায় দুই দশকের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা নিয়ে দলটির বহু নেতাকর্মী বছরের পর বছর রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। তাদের অনেকেই আশা করেছিলেন, দল ক্ষমতায় এলে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে, কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ বাড়বে এবং প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ন্যায়সংগত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরাই দীর্ঘদিন বিএনপির সাংগঠনিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছেন। কঠিন সময়ে তারা দলীয় কর্মসূচি পালন করেছেন, মামলা মোকাবিলা করেছেন এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দলকে ধরে রেখেছেন।
কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর যদি সেই নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা পূরণ না হয়, তাহলে হতাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
বিভিন্ন মহলে অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রভাবশালী নেতা, জনপ্রতিনিধি ও তাদের ঘনিষ্ঠজনেরা প্রশাসনিক প্রভাব, ব্যবসায়িক সুবিধা কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। কোথাও কোথাও দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়া, স্বজনপ্রীতি এবং ত্যাগী কর্মীদের উপেক্ষা করার অভিযোগও উঠছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। তবে অভিযোগগুলো যদি বাস্তবতার প্রতিফলন হয়, তাহলে তা বিএনপির সাংগঠনিক ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক।
কারণ, ক্ষমতা অর্জন করা যেমন রাজনৈতিক সাফল্য, তেমনি সেই ক্ষমতার সুফল সাধারণ মানুষ ও দলের তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া আরও বড় দায়িত্ব।
অফিস-আদালতে তৃণমূলের অবস্থান কোথায়?
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও প্রশাসন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আগের ব্যবস্থার প্রভাব কতটা রয়ে গেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিএনপির তৃণমূলের কিছু নেতাকর্মীর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিদের কেউ কেউ এখনো নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন।
তাদের দাবি, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও স্থানীয় পর্যায়ে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। অন্যদিকে, কিছু প্রভাবশালী বিএনপি নেতার সঙ্গে আগের ক্ষমতাসীন দলের ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত বা আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে এসব বিষয়ে কার্যকর প্রতিবাদ হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বা আত্মীয়তার সম্পর্ক নয়, বরং তার কাজ, যোগ্যতা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং আইন মেনে চলার বিষয়গুলোই মূল্যায়নের ভিত্তি হওয়া উচিত।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। প্রশাসন পরিচালিত হওয়া উচিত আইন, যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে। একইভাবে, তৃণমূলের নেতাকর্মীদেরও দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা না করে ন্যায্য অধিকার, কর্মসংস্থান ও সমান সুযোগের দাবি তোলা উচিত।
হতাশা থেকে দেশত্যাগের চিন্তা
যেসব নেতাকর্মী দীর্ঘদিন রাজনৈতিক সংগ্রাম করেছেন, তাদের একটি অংশ যদি মনে করেন যে দল ক্ষমতায় যাওয়ার পরও তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তাহলে তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। কেউ রাজনীতি থেকে দূরে সরে যেতে পারেন, কেউ ব্যবসা বা অন্য পেশায় মনোযোগ দিতে পারেন, আবার কেউ বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারেন।
তবে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে দেশত্যাগের প্রবণতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য ও পরিসংখ্যান প্রয়োজন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বিচ্ছিন্ন অভিযোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলো দিয়ে সামগ্রিক প্রবণতা নিশ্চিত করা যায় না।
তারপরও রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ: দীর্ঘদিনের ত্যাগী কর্মীরা যদি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা হারান, তাহলে দলের সাংগঠনিক শক্তি কতটা অটুট থাকবে?
একটি দল শুধু সংসদ সদস্য, মন্ত্রী কিংবা কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। দলকে টিকিয়ে রাখেন ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কর্মীরা। তাদের সঙ্গে নেতৃত্বের দূরত্ব বাড়লে সাংগঠনিক দুর্বলতা তৈরি হতে পারে।
বিএনপির সামনে এখন কী করণীয়?
বিএনপির নেতৃত্বের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষমতার রাজনীতি ও সাংগঠনিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।
প্রথমত, ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়নের জন্য স্বচ্ছ নীতিমালা প্রয়োজন। দলীয় পদ, দায়িত্ব ও সুযোগ বণ্টনে ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিবর্তে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং সাংগঠনিক অবদানকে গুরুত্ব দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে আইনের ভিত্তিতে পরিচালনার উদ্যোগ নিতে হবে। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানি করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি অপরাধের অভিযোগ থাকলে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে দায়মুক্ত রাখাও উচিত নয়।
চতুর্থত, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। তাদের অভিযোগ শোনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। জনগণের আস্থা অর্জনই একটি রাজনৈতিক দলের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের প্রধান ভিত্তি।
শেষ কথা: তৃণমূলকে অবহেলা করলে মূল্য দিতে হয়
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসন ও পতনের ইতিহাস থেকে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলেই কোনো দল স্থায়ীভাবে শক্তিশালী হয়ে যায় না। জনগণের অধিকার, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র উপেক্ষা করলে একসময় সেই দলের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিএনপির জন্যও একই শিক্ষা প্রযোজ্য। দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের হতাশা, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
তৃণমূলকে উপেক্ষা করে শুধু ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি চালিয়ে গেলে দলীয় ঐক্য দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। আর সেই শূন্যতা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে ভবিষ্যতে আরেকটি গণ-অভ্যুত্থান ঘটবেই—এমন পূর্বাভাস দেওয়ার সুযোগ নেই। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, জনগণের অসন্তোষকে অবহেলা করা হলে রাজনৈতিক সংকট গভীর হতে পারে।
ক্ষমতা সাময়িক, কিন্তু জনগণের আস্থা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শক্তির মূল ভিত্তি। বিএনপির নেতৃত্ব যদি সময় থাকতে তৃণমূলের কথা শোনে, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় এবং ন্যায়সংগত রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে দলটি আরও শক্তিশালী হতে পারে। অন্যথায়, আজকের উপেক্ষিত কর্মীরাই একসময় দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।
তৃণমূল দুর্বল হলে নেতৃত্বও দুর্বল হয়—এই সত্য উপলব্ধি করার সময় এখনই।
সম্পাদক ও প্রকাশক কাজী আবির আসলাম।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:১২০ নর্দান ভার্সিটি রোড( দ্বিতীয় তলা) এয়ারপোর্ট, ১২৩০ ঢাকা।
phone :01933661936
Email : dhakanewsbd24@gmail.com
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৫