জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশন: কূটনীতি, অর্থনীতি ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে ব্যস্ত প্রধানমন্ত্রী
Dhakanewsbd24
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রিপোর্ট :এস এম তাইজুল ইসলাম
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে ঘিরে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা ছিল বেশ ব্যস্ত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম দিনেই একাধিক দ্বিপক্ষীয়, বহুপক্ষীয়, মানবিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ সেই ব্যস্ততারই প্রতিফলন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদি আমিন জানিয়েছেন, নিউইয়র্কে প্রথম দিন প্রধানমন্ত্রী মোট ১০টি কর্মসূচিতে অংশ নেন। এসব কর্মসূচির মধ্যে ছিল বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বৈঠক, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা।
দিনের শুরু হয় জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত বিশ্বনেতা ও তাঁদের সহধর্মিণীদের সম্মানে দেওয়া প্রাতরাশের মধ্য দিয়ে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান সেখানে অংশ নেন এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কে যোগ দেন।
প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক কূটনীতি
জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রধানমন্ত্রী ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে এবং মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট উজ হুসাইন মোহাম্মদ লতিফের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন।
বৈঠকগুলোতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করা, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। পর্যটন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিদ্যমান সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো আরও বিস্তৃত করার বিষয়েও মতবিনিময় হয়।
তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা
সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ছিল তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক।
নিউইয়র্কের তুর্কি হাউসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ ও তুরস্কের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে বাণিজ্য, অর্থনীতি ও বিনিয়োগের পরিধি বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে দুই নেতা মতবিনিময় করেন।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়েও দুই দেশের সমন্বয় ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার গুরুত্ব উঠে আসে।
রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় মানবিক ও কূটনৈতিক ইস্যু রোহিঙ্গা সংকটও প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কামনা করেন।
এ ছাড়া জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহর সঙ্গে বৈঠকেও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়।
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণেও প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে উন্নয়ন ও অর্থনীতি
নিউইয়র্কে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকও ছিল সফরের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি।
বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয় আলোচনা হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, বাণিজ্য, নিয়ন্ত্রক সংস্কার ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়েও মতবিনিময় হয়।
হাইতির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক
প্রধানমন্ত্রী হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ে ফিলস-আইমের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এতে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, পারস্পরিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।
ভবিষ্যতে দুই দেশের সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
জলবায়ু ও মানবিক সহযোগিতা
জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘Climate Action and the Just Transition’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জলবায়ু অর্থায়ন এবং ন্যায়সংগত রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দেন।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, বৈশ্বিক মানবিক চ্যালেঞ্জ ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব নিয়ে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়।
মেটার সঙ্গে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা
সফরের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দিকের আরেকটি বিষয় ছিল মেটার সঙ্গে যোগাযোগ।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মেটার সরাসরি বৈঠক না হলেও বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল মেটার সঙ্গে বৈঠক করে। পরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম মেটার চিফ গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার জোয়েল ক্যাপলানের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে মেটার অফিস খোলার আমন্ত্রণ জানান।
বাংলাদেশের বড় ব্যবহারকারীভিত্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, ব্যবসা ও উদ্যোক্তাদের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অনলাইন হয়রানি প্রতিরোধ নিয়েও আলোচনা হয়।
বিশ্বনেতাদের সঙ্গে অভ্যর্থনায় প্রধানমন্ত্রী
সফরের আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়োজিত বিশ্বনেতা ও তাঁদের সহধর্মিণীদের সম্মানে দেওয়া অভ্যর্থনাতেও অংশ নেন। এর আগে জাতিসংঘ মহাসচিবের আয়োজিত প্রাতরাশেও তিনি বিশ্বনেতাদের সঙ্গে অংশ নেন।
সব মিলিয়ে নিউইয়র্ক সফরের কর্মসূচিতে কূটনীতি, অর্থনীতি ও মানবিক ইস্যু গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতা, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতি এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সমর্থন—এসব বিষয় আলোচনায় এসেছে।
২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।
এবারের অধিবেশনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ফলে নিউইয়র্কের এবারের আয়োজন বাংলাদেশের জন্য শুধু জাতিসংঘের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, উন্নয়ন সহযোগিতা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন জাতীয় স্বার্থ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক কাজী আবির আসলাম।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:১২০ নর্দান ভার্সিটি রোড( দ্বিতীয় তলা) এয়ারপোর্ট, ১২৩০ ঢাকা।
phone :01933661936
Email : dhakanewsbd24@gmail.com
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৫