ঘুমিয়ে থাকা শিশুটি আর জেগে উঠবে না: মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় একই পরিবারের ৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু
লক্ষ্মীপুর | ৬ আগস্ট ২০২৫
লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার সীমান্তবর্তী চন্দ্রগঞ্জ পূর্ববাজার এলাকায় খালে পড়ে যাওয়া একটি মাইক্রোবাস থেকে উদ্ধার করা হয় একই পরিবারের সাত সদস্যের নিথর দেহ। তাদের মধ্যে ছিল একটি শিশুও—যার মুখে ছিল ঘুমন্ত প্রশান্তি, অথচ সে ঘুম ভাঙার আগেই থেমে গেছে তার জীবন।
মাইক্রোবাসটি ওমানপ্রবাসী আবদুল বাহারকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রিসিভ করে নিয়ে যাচ্ছিলো নোয়াখালীর নিজ বাড়িতে। পথে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় বাহারের স্ত্রী, সন্তান, বোন, ভাগ্নে-ভাগ্নিসহ সাতজন। একমাত্র জীবিত উদ্ধার হন প্রবাসী আবদুল বাহার।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গাড়ির চালক ঘুমিয়ে পড়ায় মাইক্রোবাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক থেকে সোজা খালে পড়ে যায়। পানি থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে দেখা যায়, শিশুটি এমনভাবে পড়ে ছিল যেন কেউ কোলে নিয়ে ঘুম পাড়িয়েছে। উদ্ধারকর্মীদের অনেকেই কান্না ধরে রাখতে পারেননি।
একজন উদ্ধারকারী বলেন, “বাচ্চাটা দেখে মনে হচ্ছিল ঘুমাচ্ছে। কিন্তু জানি, আর কোনোদিন জেগে উঠবে না। ওর বয়স বড়জোর দুই হবে। এমন নিষ্পাপ মুখ মৃত্যুর কথা বলে না।”
‘স্বপ্ন বাড়ি যাবে আমার’ — আবেগঘন স্ট্যাটাস, আর ফিরে পাওয়া গেলো লাশ
মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কিছুদিন আগে প্রবাসী আবদুল বাহার নিজের ফেসবুকে লিখেছিলেন — “স্বপ্ন বাড়ি যাবে আমার।” স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তাঁকে ফিরতে হলো পরিবারের সাতটি লাশ নিয়ে। আনন্দ-উৎসবের বদলে তাঁকে স্বজন হারানোর হাহাকার বরণ করতে হলো।
একটি সংস্কৃতি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে — একজন প্রবাসীকে রিসিভ করতে ঢাকায় পুরো পরিবারের যাওয়ার প্রয়োজন কতটা ছিল? কেন এমন একটি অপ্রয়োজনীয় সংস্কৃতির চর্চা হচ্ছে যেখানে প্রাণনাশের ঝুঁকি থাকে?
অনেকেই বলছেন, “যে ব্যক্তি সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ওমান থেকে দেশে ফিরতে পারেন, তিনি একা নিজ বাড়ি পৌঁছাতে পারেন না?”
বিশ্লেষকরা মনে করেন, পারিবারিক আবেগের কারণে অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন — যা কখনো কখনো পুরো পরিবারের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।
বিধিনিষেধ কার্যকর হয়নি?
সম্প্রতি একটি সংবাদে দাবি করা হয়েছিল যে, ২৭ জুলাইয়ের পর থেকে বিমানবন্দরে কোনো যাত্রীকে রিসিভ বা সি-অফ করতে দুজনের বেশি লোক প্রবেশ করতে পারবে না। কিন্তু এই পরিবার কীভাবে ঢাকায় দলবেঁধে পৌঁছাল — সেই প্রশ্নও এখন আলোচনায়।
শেষকথা
আবদুল বাহার এখন নিঃসঙ্গ। তাঁর জীবনের সবথেকে প্রিয় মানুষগুলোকে হারিয়ে তিনি ফিরে এসেছেন এক গাঢ় শূন্যতা নিয়ে।
এই দুর্ঘটনা আমাদের একটি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে — আমরা কী কখনো আবেগ আর দায়িত্ববোধের মাঝে ভারসাম্য খুঁজে পাব?
আমরা নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং আল্লাহ্র কাছে দোয়া করছি — তিনি বাহার ভাইকে এই শোক সহ্য করার শক্তি দিন।

