হাসিনার মতো গণআন্দোলনে ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়েছেন যেসব বিশ্বনেতা
Dhakanewsbd24 ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৫
বিশ্বরাজনীতিতে এমন বহু প্রভাবশালী নেতার নাম রয়েছে, যাদের জনগণের বিক্ষোভ, সামরিক অভ্যুত্থান কিংবা গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যেতে হয়েছে নির্বাসনে। কেউ প্রাণরক্ষার জন্য, কেউ আবার কারাবাস বা মৃত্যুদণ্ড এড়াতে দেশ ত্যাগ করেছেন।
সবশেষ এই তালিকায় যোগ হয়েছে মাদাগাস্কারের প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি রাজোয়েলিনার নাম। কয়েক সপ্তাহ ধরে তরুণদের নেতৃত্বে চলা বিক্ষোভের পর সম্প্রতি সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন তিনি।
শেখ হাসিনা
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন বাংলাদেশের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে তিনি ভারতে পালিয়ে যান। জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সে সময়ের দমনপীড়নে অন্তত ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন।
বাশার আল-আসাদ
২০২৪ সালে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ বিদ্রোহীদের চাপের মুখে রাশিয়ায় পালিয়ে যান। এর মধ্য দিয়ে তার পরিবারের টানা ৫১ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। মস্কো ও তেহরানের সমর্থনে দীর্ঘ ১৩ বছর গৃহযুদ্ধ চালিয়ে আসা আসাদ বর্তমানে মস্কোয় আশ্রয়ে রয়েছেন।
গোতাবায়া রাজাপাকসে
শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে ২০২২ সালের জুলাইয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট ও গণবিক্ষোভের মুখে মালদ্বীপে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে তিনিসহ তার ভাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে ও অন্যান্য আত্মীয়রা পদত্যাগ করেন। খাদ্য, জ্বালানি ও বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি জনরোষ সৃষ্টি করেছিল রাজাপাকসে পরিবারের শাসনের বিরুদ্ধে।
ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ
২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কিয়েভে সহিংস বিক্ষোভের পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ রাশিয়ায় পালিয়ে যান। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করে রাশিয়ার কাছ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত তার পতনের সূচনা করে। পরে পার্লামেন্ট তাকে অভিশংসন করে ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ধারণা করা হয়, রুশ সেনারা তাকে ক্রিমিয়ার পথে পালাতে সহায়তা করেছিল।
মুয়াম্মার গাদ্দাফি
লিবিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি ২০১১ সালের আরব বসন্তে ক্ষমতাচ্যুত হন। রাজধানী ত্রিপোলি বিদ্রোহীদের দখলে গেলে তিনি নিজ শহর সির্তেতে পালিয়ে আত্মগোপনে থাকেন। একই বছরের ২০ অক্টোবর ন্যাটোর বিমান হামলায় তার কনভয় আক্রান্ত হলে বিদ্রোহীরা তাকে হত্যা করে। পরে তার দেহ প্রকাশ্যে প্রদর্শনের পর মরুভূমির এক অজ্ঞাত স্থানে দাফন করা হয়।
মার্ক রাভালোমানানা
মাদাগাস্কারের ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট মার্ক রাভালোমানানা ২০০৯ সালে তৎকালীন মেয়র আন্দ্রি রাজোয়েলিনার নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন। পরে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় পালিয়ে যান এবং অনুপস্থিতিতে আজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। পাঁচ বছর নির্বাসনে থাকার পর ২০১৫ সালে দেশে ফিরে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি পান।
জ্যঁ-বের্ত্রঁ আরিস্তিদ
হাইতির প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জ্যঁ-বের্ত্রঁ আরিস্তিদ দুইবার দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। প্রথমবার ১৯৯১ সালে সামরিক অসন্তোষে উৎখাত হন, পরে ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ফিরে আসেন। ২০০০ সালে পুনর্নির্বাচিত হলেও ২০০৪ সালে বিদ্রোহের মুখে আবারও দেশ ছাড়েন এবং মার্কিন সহায়তায় মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকায় আশ্রয় নেন ও ২০১১ সালে হাইতিতে ফিরে আসেন।
আন্দ্রি রাজোয়েলিনা
২০০৯ সালে গণবিক্ষোভে প্রেসিডেন্ট রাভালোমানানাকে পদত্যাগে বাধ্য করে ক্ষমতায় বসেছিলেন আন্দ্রি রাজোয়েলিনা। তখন তার বয়স মাত্র ৩৪ বছর। সম্প্রতি দেশটিতে পানি ও বিদ্যুৎ সংকট ঘিরে বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরে বেকারত্ব, দুর্নীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। সেনাবাহিনী তার প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করলে শেষ পর্যন্ত তিনি দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।
—
বিশ্লেষণ:
রাজনৈতিক ইতিহাস প্রমাণ করে, জনগণের প্রতিরোধের মুখে দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরশাসনও টিকে থাকতে পারে না। একের পর এক দেশে গণআন্দোলনই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছে— যা আবারও প্রমাণ করেছে, শাসক নয়, জনগণই সর্বোচ্চ ক্ষমতার উৎস।

