তারেক রহমানকে দিল্লিতে নিতে কেন আগ্রহী ভারত
DhakaNewsBD24
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ভারতের রাজধানী দিল্লির আগ্রহ বাড়ছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ঢাকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই ভারত নতুন সরকারের প্রধানকে দিল্লিতে নিতে আগ্রহী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে পাঠানো একটি ই-মেইল প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ই-মেইলে জানানো হয়েছিল, সপ্তাহের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। কারণ হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর মহড়ার জন্য সময় প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে ওই সময় পর্যন্ত তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ই-মেইলটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। কিন্তু এর মধ্যেই সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে জল্পনা আরও জোরালো হয়।
তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ এম সালেহ। তিনি বলেন, ‘সফর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’
তারেক রহমানকে নিয়ে দিল্লির এত আগ্রহ কেন?
ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় পেয়ে সরকার গঠন করে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এটিই হতে পারে তার প্রথম ভারত সফর।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করতে চায় ভারত। বিশেষ করে দুই দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ঢাকার সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা দিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে দুই দেশের সম্পর্কে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে আছে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনাকে ফেরত চায় ঢাকা
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশের একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। তবে শেখ হাসিনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। ঢাকা দ্রুত প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে। ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধটি তারা বিবেচনা করছে।
এর মধ্যেই বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে দিল্লি বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ভারত তাকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
ভারতের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিশেষ অভ্যর্থনা দেওয়া হতে পারে।
দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্ব
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত যোগাযোগ। বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, নদীর পানি এবং সীমান্ত নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ জড়িত।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশ ও ভারত সড়ক, রেল ও বন্দর যোগাযোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে। এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগও সহজ হয়েছে। নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও দুই দেশ দীর্ঘদিন ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে।
তবে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশে বিতর্কের জন্ম দেয়। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নে ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।
হাসিনার বক্তব্যে নতুন উত্তেজনা
গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানান। একই সঙ্গে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে নিজের সমর্থকদের দমনের অভিযোগও করেন তিনি।
ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্যের ঘটনায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ওই অনুষ্ঠানে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং বাংলাদেশের সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে করা মন্তব্যকে তারা সমর্থন করে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিনের মতে, শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ফলে ভারত সত্যিই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে কতটা আন্তরিক—সেটি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
‘মক্কা চুক্তি’ ও পাকিস্তান প্রসঙ্গ
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে ভারতের আগ্রহের পেছনে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ‘মক্কা চুক্তি’ ঘিরে বাংলাদেশেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে উঠলে বাংলাদেশও তাতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের সম্ভাব্য ঘনিষ্ঠতা এবং ঢাকার সঙ্গে অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির যোগাযোগ বাড়ার বিষয়টিও দিল্লির নজরে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সামনে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চ
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ভারত একটি ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
ফলে এর আগে বা ওই সময়ের কাছাকাছি তারেক রহমানের দিল্লি সফর হলে সেটি দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত সফরটি হবে কি না, কিংবা হলে তার সময়সূচি ও এজেন্ডা কী হবে—তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। তাই দিল্লির আগ্রহ স্পষ্ট হলেও সফর নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য দুই দেশের সরকারি ঘোষণার অপেক্ষাই করতে হবে।

