সিভিল সার্ভিস থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে ইসমাইল জবিউল্লাহ
dhakanewsbd24
প্রকাশ :১৯ আগস্ট ২০২৬
ঢাকা: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে সাবেক প্রভাবশালী আমলা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রশাসন, বিচার, কূটনীতি, অর্থনীতি, গবেষণা ও রাজনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ইসমাইল জবিউল্লাহর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল শিক্ষকতা দিয়ে। ১৯৭৩ সালে চৌমুহনী কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। একই সময়ে চন্দ্রগঞ্জ কফিলউদ্দিন কলেজে খণ্ডকালীন অধ্যাপনা এবং পরে নোয়াখালী সরকারি কলেজে ইংরেজির প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের প্রথম নিয়মিত সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৭৭ সালে সহকারী কমিশনার (ম্যাজিস্ট্রেট) হিসেবে চট্টগ্রামে প্রশাসনিক কর্মজীবন শুরু করেন।
মেধাবী ছাত্র থেকে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে
১৯৫০ সালে তৎকালীন নোয়াখালী জেলার বর্তমান লক্ষ্মীপুরের রামগতি থানাধীন শান্তির হাট (চরকাদিরা) মোক্তারবাড়িতে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন ইসমাইল জবিউল্লাহ। তাঁর বাবা মরহুম সুজাউদ্দিন আহমেদ ছিলেন লক্ষ্মীপুর সামাদ একাডেমির শিক্ষক।
১৯৬৫ সালে লক্ষ্মীপুর সামাদ একাডেমি থেকে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের মেধাতালিকায় ১২তম স্থান এবং ১৯৬৭ সালে লক্ষ্মীপুর কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকে একই বোর্ডে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (অনার্স) ও এমএ ডিগ্রির পাশাপাশি এলএলবি পরীক্ষাতেও প্রথম স্থান অধিকার করেন।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জাপানের এডিবি ইনস্টিটিউট থেকে উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
প্রশাসন ও কূটনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা
কর্মজীবনে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ম্যাজিস্ট্রেট ও সামরিক আইন আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বিভিন্ন সময়ে যোগাযোগ, স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবেও কাজ করেন।
১৯৮৬ সালে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং ২০০২ সালে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব, নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ইআরডি এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ২০০৮ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও রয়েছে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ব্রুনাই ও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে শ্রম কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক, বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও আইএমএফের বিকল্প গভর্নরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।
অবসরের পরও সক্রিয় প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা
সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক এবং আইসিডিডিআর,বির বোর্ড অব গভর্নরসের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।
শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। বর্তমানে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও তেজগাঁও উইমেনস কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ অ্যালামনাই সোসাইটির সভাপতিও।
বিএনপির নীতি নির্ধারণে সক্রিয়
২০১৬ সাল থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন ইসমাইল জবিউল্লাহ। ২০২৬ সালের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ও পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।
বিএনপির গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট রিসার্চ সেন্টারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও গবেষণা প্রধান এবং সাবেক আমলাদের সংগঠন ‘পলিসি ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিসার্চ সোসাইটি’র চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
দলীয় বিভিন্ন নীতি ও রাষ্ট্র সংস্কারমূলক উদ্যোগেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। বিএনপি ঘোষিত ভিশন-২০৩০, ২৭ দফা, রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নে তিনি ভূমিকা রেখেছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। জুলাই সনদ প্রণয়ন ও সংস্কারবিষয়ক ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রমেও বিএনপির প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন তিনি।
লক্ষ্মীপুরের উন্নয়ন ও সমাজসেবায় ভূমিকা
শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক জীবনে লক্ষ্মীপুরসহ বৃহত্তর নোয়াখালীর মানুষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানাসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততার কথাও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচিত।
দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, অর্থনীতি, গবেষণা ও নীতি নির্ধারণের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে ইসমাইল জবিউল্লাহর রাজনৈতিক ভূমিকা বিএনপিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন দলটির নেতাকর্মীরা।

