গুম-মৃত্যুর স্মৃতিতে তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের পাঁচ মুখ
DhakaNewsBD24
প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তেজগাঁও কলেজের দীর্ঘ ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলও একটি পরিচিত অধ্যায়। বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন-সংগ্রাম ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বহু শিক্ষার্থী ও তরুণ। তাঁদের কেউ পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন, কেউ হারিয়ে গেছেন সময়ের স্রোতে।
তবে সংগঠনটির ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাঁদের স্মৃতি আজও পুরোনো নথি ও ছবিতে সংরক্ষিত। তাঁদের কারও রাজনৈতিক পথচলা গুমের ঘটনায় থেমে গেছে, কেউ নিহত হয়েছেন কথিত ‘ক্রসফায়ারে’। তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের এমন পাঁচ নেতাকর্মী হলেন—আমিনুল ইসলাম জাকির, তরিকুল ইসলাম ঝন্টু, মুজাহিদুল ইসলাম জিহাদ ভূঁইয়া, মো. রাহাত ও আরিফুল ইসলাম মুকুল।
তাঁদের কেউ ছিলেন সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে, কেউ ছিলেন মাঠপর্যায়ের কর্মী। কারও নামের পাশে রয়েছে ‘গুম’, আবার কারও ক্ষেত্রে রয়েছে ‘শহীদ’ ও ‘ক্রসফায়ার’-এর উল্লেখ। পাঁচটি ছবি যেন তেজগাঁও কলেজের ছাত্ররাজনীতির একটি বিস্মৃত সময়কে সামনে নিয়ে আসে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি। পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংগঠনটির কার্যক্রম বিস্তৃত হয়।
তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের পৃথক প্রতিষ্ঠার নির্দিষ্ট সাল বা তারিখ নিয়ে প্রকাশ্য নথিতে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। তবে বিভিন্ন নথি ও দলীয় সূত্রে আশির দশকের শুরু থেকেই তেজগাঁও কলেজে সংগঠনটির কার্যক্রম থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
বিভিন্ন সময়ে তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের নেতৃত্বে এসেছেন বিভিন্ন প্রজন্মের নেতাকর্মী। তাঁদের কেউ জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত হয়েছেন, কেউ ছাত্ররাজনীতির গণ্ডিতেই রেখে গেছেন নিজের স্মৃতি। সেই ধারাবাহিকতায় উঠে আসে এই পাঁচটি নাম।
আমিনুল ইসলাম জাকির
আমিনুল ইসলাম জাকির
সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি, তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদল
তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম আমিনুল ইসলাম জাকির। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।
পরিবার ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ৭ এপ্রিল রাত আনুমানিক ৯টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দেওয়া একদল ব্যক্তি তাঁকে রাজধানীর গুলশান-২-এর ধানসিঁড়ি রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি।
জাকিরের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংবাদ নথিতে উঠে আসে। ২০১৭ সালে বিএনপির প্রকাশিত গুম হওয়া নেতাকর্মীদের তালিকাতেও তাঁর নাম ছিল বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।
নিখোঁজ হওয়ার পর কেটে গেছে এক দশকেরও বেশি সময়। তবে পরিবারের সদস্য ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের কাছে আমিনুল ইসলাম জাকিরের স্মৃতি এখনো অমলিন।
তরিকুল ইসলাম ঝন্টু
তরিকুল ইসলাম ঝন্টু
যুগ্ম সম্পাদক, তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদল
তরিকুল ইসলাম ঝন্টু ছিলেন তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক।
২০১৩ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি নিখোঁজ হন। এরপর থেকে তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে পরিবার ও দলীয় সূত্রের দাবি।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। ২০১৬ সালে ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশের সময় তেজগাঁও কলেজ শাখার তালিকায় তরিকুল হাসান ঝন্টুর নামের পাশে ‘গুম’ উল্লেখ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। এছাড়া ২০১৭ সালে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রকাশিত গুম হওয়া ২৫ নেতাকর্মীর তালিকাতেও তাঁর নাম ছিল।
২০১৩ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে তাঁর পরিবারের জন্য শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষা। বছর পেরিয়েছে, সময় বদলেছে; কিন্তু ঝন্টুর অবস্থান নিয়ে প্রশ্নটির কোনো উত্তর মেলেনি।
মুজাহিদুল ইসলাম জিহাদ ভূঁইয়া
মুজাহিদুল ইসলাম জিহাদ ভূঁইয়া
সাধারণ সম্পাদক, তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদল
তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের ইতিহাসে মুজাহিদুল ইসলাম জিহাদ ভূঁইয়া একটি উল্লেখযোগ্য নাম। তিনি ছিলেন সংগঠনটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী একজন সক্রিয় ছাত্রনেতা।
দলীয় ও সহকর্মীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বিএনপির রাজনৈতিক দুঃসময়ে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি সক্রিয় ছিলেন। লক্ষ্মীপুরে জন্ম নেওয়া এই ছাত্রনেতা ২০১৫ সালের ২২ জানুয়ারি কথিত ‘ক্রসফায়ারে’ গুরুতরভাবে আহত হন এবং ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তাঁর মৃত্যু হয় বলে দলীয় সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
আজ তাঁর ছবি তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের সংরক্ষিত ইতিহাসের একটি অংশ। সময়ের সঙ্গে ক্যাম্পাসের অনেক কিছু বদলে গেলেও নথিতে তাঁর পরিচয় থেকে গেছে—সাধারণ সম্পাদক, তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদল।
মো. রাহাত
মো. রাহাত
কর্মী, তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদল
মো. রাহাত ছিলেন তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের একজন কর্মী।
লক্ষ্মীপুরে জন্ম নেওয়া এই ছাত্রদলকর্মী ২০১৫ সালের ২২ জানুয়ারি যাত্রাবাড়ীতে কথিত ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হন বলে দলীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সংগঠনের ইতিহাসে শীর্ষ নেতাদের নাম সাধারণত বেশি আলোচিত হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কর্মীদের অবদান অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। রাহাতের ছবিটি সেই আড়ালে থাকা কর্মীদের প্রতিনিধিত্ব করে।
তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মী হিসেবে তাঁর নাম সংগঠনের নথিতে সংরক্ষিত রয়েছে। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে তাঁর মৃত্যুর ঘটনাও সেই স্মৃতির অংশ হয়ে আছে।
আরিফুল ইসলাম মুকুল
আরিফুল ইসলাম মুকুল
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদল
ফেসবুকে আরিফুল ইসলাম মুকুলের শেষ স্ট্যাটাস হিসেবে উদ্ধৃত করা হয়—‘আজ সবাইকে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত শোনার জন্য পোস্ট করলাম।’
২০১৫ সালের ২৯ জানুয়ারি তিনি তাঁর ফেসবুক আইডিতে ওই স্ট্যাটাস দেন বলে তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীরা জানান। একই রাতে বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে সদরঘাটে গেলে সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে তুলে নিয়ে যায় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়।
ছাত্রদল নেতা আরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন। রাজনীতি, ২০ দলীয় জোটের কর্মসূচি, দলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার এবং কথিত ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে তাঁর বিভিন্ন স্ট্যাটাসের কথাও সহকর্মীরা উল্লেখ করেন।
তাঁকে কারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল—সে বিষয়ে পরবর্তীতে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে পরিবার ও সহকর্মীদের বক্তব্য। ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ঢাকার রূপনগরে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরিফুল ইসলাম মুকুলের মৃত্যু তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের ইতিহাসে আরেকটি বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
পাঁচ মুখ, এক ইতিহাস
আমিনুল ইসলাম জাকির, তরিকুল ইসলাম ঝন্টু, মুজাহিদুল ইসলাম জিহাদ ভূঁইয়া, মো. রাহাত ও আরিফুল ইসলাম মুকুল—পাঁচটি নাম, পাঁচটি আলাদা গল্প। তাঁদের কেউ নিখোঁজ হয়েছেন, কেউ প্রাণ হারিয়েছেন; কিন্তু তাঁদের ছবি ও নাম রয়ে গেছে তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের রাজনৈতিক স্মৃতিতে।
সময় বদলায়, প্রজন্ম বদলায়, ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক বাস্তবতাও বদলে যায়। কিন্তু কোনো কোনো মানুষের গল্প ইতিহাসের পাতায় থেকে যায় প্রশ্ন হয়ে—তাঁদের কী হয়েছিল, কেন হয়েছিল এবং তাঁদের পরিবারের অপেক্ষার শেষ কোথায়?
তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের এই পাঁচ মুখ সেই প্রশ্নগুলোরই নীরব সাক্ষী।

