♦ জুলাই জাতীয় সনদে অনৈক্য ♦ সংসদ নির্বাচন নিয়েই শঙ্কা
Dhakanewsbd24 | আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৫
স্বৈরাচারবিরোধী জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগ ছাড়া সব রাজনৈতিক দল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিল। সংস্কার কমিশন ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রমেও সহযোগিতা করেছিল দলগুলো। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যাশা ছিল— সরকার বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন সম্পন্ন করে সসম্মানে বিদায় নেবে।
কিন্তু মাত্র ১৫ মাসের মাথায় প্রায় সব দল সরকারের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনেছে। ঐকমত্য কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়েই এই ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রতিশ্রুত জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
—
দলগুলোর অভিযোগ ও অবস্থান
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “জুলাই জাতীয় সনদ ও তার বাস্তবায়ন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার দেশ ও জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এটি রাজনৈতিক প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়।”
তিনি অভিযোগ করেন, কিছু মহল নির্বাচন বিলম্বিত করার ষড়যন্ত্র করছে।
জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, প্রধান উপদেষ্টা সময়ক্ষেপণ না করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করতে হবে। বিলম্ব হলে সরকার জনগণের আস্থা হারাবে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। ভবিষ্যতের সরকার যদি প্রতারক হয়, তাহলে জনগণের করার কিছু থাকবে না।” তিনি দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানান।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গণমাধ্যমে বলেন, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন আদেশে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থাকবে না। সংবিধান সংস্কার বিষয়ে ঐকমত্য কমিশন যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, তা গণভোটে নিতে হবে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, বাংলাদেশ এখন দুইটি নির্বাচনের ঝুঁকি নিতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশ দিতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, “আমাদের ইতিহাসের দুর্ভাগ্য, আমরা স্বৈরাচার সরাই, আবার নিজেদের মধ্যেই স্বৈরাচার জন্ম দিই।”
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর অভিযোগ করেন, জুলাই সনদের নামে রাজনীতিতে বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে। তার মতে, এই বিভাজন কাটানো না গেলে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হবে।
—
রাজনৈতিক অনৈক্য ও জুলাই সনদ বিতর্ক
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই বিপ্লব দেশের রাজনীতিতে নতুন আশার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ঐক্য ভেঙে যাচ্ছে। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে বিএনপি কিছু বিষয়ে “নোট অব ডিসেন্ট” দিলেও চূড়ান্ত রিপোর্টে তা বাদ দেওয়া হয়। বিএনপি এটিকে “রাজনৈতিক প্রতারণা” হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে এনসিপি বলছে, ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদ না দিলে তারা সনদে স্বাক্ষর করবে না।
বিএনপি চায় গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে, জামায়াত চায় গণভোট আগে, আর এনসিপি বলছে জাতীয় ভোটের আগে গণভোট সম্পন্ন করতে হবে। এই অবস্থানগত পার্থক্যই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় “হ্যাঁ–না” প্রচারণায় রূপ নিয়েছে।
—
নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা
আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে প্রস্তুতি শুরু করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোও মাঠে নেমেছে।
কিন্তু জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে দ্বন্দ্বে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এর সঙ্গে রয়েছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নানা “উসকানি ও ষড়যন্ত্র”।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, “নির্বাচন বানচালে হঠাৎ আক্রমণ আসতে পারে।” এতে জনমনে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, “জুলাই সনদ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার সঠিক সমাধান না হলে নির্বাচনের অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে।”
—
সরকারের অবস্থান
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “গণভোট ইস্যুতে প্রধান উপদেষ্টা সিদ্ধান্ত নেবেন। বিভিন্ন দল তাদের মতামত দিচ্ছে, আমরা এটাকে হুমকি হিসেবে দেখছি না। নির্বাচন ১৫ ফেব্রুয়ারির আগেই হবে।”

