শাপলা ‘ফ্লাশ আউট’ অপারেশন: অন্যতম কুশীলব সাবেক ডিআইজি জলিল মন্ডল
Dhakanewsbd24
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬
মতিঝিলের শাপলা চত্বরে আলেমদের হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগে পরিচালিত ‘অপারেশন ফ্লাশ আউট’-এর অন্যতম কুশীলব হিসেবে সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মন্ডলের নাম উঠে এসেছে। ডিএমপির তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে তিনি ওই অভিযানে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযানে নেতৃত্বদানকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের একটি কোর কমিটির সদস্য ছিলেন জলিল মন্ডল। ওই কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ। অভিযানের কৌশল নির্ধারণ, বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং নিরাপত্তা বলয় তদারকিতে জলিল মন্ডলের সক্রিয় ভূমিকার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্ত সূত্রের দাবি, অভিযানের পর হতাহতদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয় এবং আলামত নষ্টের পরিকল্পনাতেও তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এ কারণে পুরো ঘটনা উন্মোচনে তাকে গুরুত্বপূর্ণ ‘তথ্যদাতা’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সোমবার রাতে রাজধানীর সবুজবাগ এলাকা থেকে সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মন্ডলকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। মঙ্গলবার তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দলের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে আদালতে হাজির করা হলে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ এপ্রিল।
ডিবিপ্রধান (অতিরিক্ত কমিশনার) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, শাপলা চত্বরে গণহত্যার একটি মামলায় ট্রাইব্যুনালের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ২০১৩ সালের ৫ মে গভীর রাতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে পরিচালিত অভিযানে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ, হত্যাকাণ্ড ও মরদেহ গুমের মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়। এসব ঘটনায় জলিল মন্ডলের সক্রিয় ভূমিকার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়।
পাবনা জেলার বাসিন্দা আব্দুল জলিল মন্ডল ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার এবং র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৬ সালে তিনি অবসরে যান। পরবর্তীতে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে তাকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই সময়েও বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তদন্তকারীরা বলছেন, তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে ৫ মে রাতের ‘চেইন অব কমান্ড’, কার নির্দেশে অভিযান শুরু হয়েছিল এবং কারা সরাসরি অংশ নিয়েছিল—এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “এই মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। ৫ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন ও আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিলের চেষ্টা চলছে।” তিনি আরও বলেন, “রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে পিওন পর্যন্ত—যেই জড়িত থাকুক, কেউ আইনের বাইরে থাকবে না।”
নিহতের সংখ্যা সম্পর্কে তিনি জানান, এ পর্যন্ত ১৫-২০ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে এবং তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে।
এদিকে, সংশ্লিষ্ট মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ২২ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যান্য আসামিদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শামছুল হক টুকু, বেনজীর আহমেদসহ আরও কয়েকজন রয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে ঘিরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। গভীর রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথভাবে অভিযান চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলির শব্দে এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
তবে ওই ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ তাদের প্রতিবেদনে ৬১ জন নিহত হওয়ার কথা বললেও, পুলিশের দাবি—রাতের অভিযানে কেউ নিহত হয়নি এবং দিনভর সংঘাতে ১১ জন নিহত হন।

