সহকর্মীদের বেতন জোগাতে নৌকা চালান প্রধান শিক্ষক
DhakaNewsBD24
প্রকাশিত: ১৩ মে ২০২৬
বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ঘেরা থানচি উপজেলার তিন্দু এলাকা—যেখানে অধিকাংশ মানুষই নিম্নআয়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। প্রতিকূল পরিবেশ সত্ত্বেও এখানে ছড়িয়ে পড়ছে শিক্ষার আলো। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি সেই আলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
বিদ্যালয়টির পরিচালনা ও সহকর্মীদের বেতন জোগাতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন। তিনি নিজেই ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে আয় করেন, আর সেই আয় থেকেই শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রদান করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালে এলাকার কিছু শিক্ষানুরাগীর উদ্যোগে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। একই বছর প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন বামং খিয়াং মিংলেন। তিনি ২০১৮ সালে কক্সবাজার সিটি কলেজ থেকে এমবিএ এবং পরবর্তীতে কক্সবাজার টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড সম্পন্ন করেন।
বর্তমানে বিদ্যালয়ে ৬ জন শিক্ষক স্বল্প বেতনে নিয়মিত পাঠদান করছেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ৮ জন শিক্ষক ও ৫ জন কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও আর্থিক সংকটের কারণে ২ জন শিক্ষক অবৈতনিকভাবে কাজ করছেন। পর্যায়ক্রমে তাদের বেতনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধান শিক্ষক জানান, শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের হওয়ায় নিয়মিত ফি আদায় সম্ভব হয় না। ফলে শুরু থেকেই শিক্ষকদের বেতন দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা দিয়ে তিনি প্রতি শুক্রবার, শনিবার ও সরকারি ছুটির দিনে থানচি-তিন্দু বড় পাথর ও রেমাক্রী ফলস রুটে পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করেন।
তিনি বলেন, “অন্য চালক রাখলে আলাদা মজুরি দিতে হয়, আবার অনেক সময় আয়ের পুরো হিসাবও পাওয়া যায় না। তাই নিজেই নৌকা চালাই—এতে খরচ বাঁচে, আর সেই টাকা দিয়ে শিক্ষকদের বেতন দিতে পারি।”
গত মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত নৌকা চালিয়ে তিনি ৪৯ হাজার ১০০ টাকা আয় করেছেন। এর মধ্যে ৩০ হাজার টাকা শিক্ষকদের বেতন-ভাতা হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও সাঙ্গু নদী পারাপারেও তিনি নিজেই সহায়তা করেন।
বর্তমানে বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৫৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। চলতি বছর নবম শ্রেণি চালু করা হয়েছে। প্রধান শিক্ষক জানান, শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেলে খাবারের ব্যবস্থা করা গেলে শিক্ষার্থী সংখ্যা আরও বাড়ানো সম্ভব।
বিদ্যালয়টি ২০২১ সালে স্থাপনের অনুমোদন পায় এবং ২০২৩ সালে নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের স্বীকৃতি লাভ করে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে পাঠদানের অনুমতি দিয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মংপ্রু অং মারমা বলেন, “আমি চেয়ারম্যান থাকাকালে ইউনিয়নের টোল-ট্যাক্স থেকে বিদ্যালয়ের তহবিলে অর্থ দিয়ে শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হতো। বর্তমানে উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া নৌকার আয় থেকেই কোনোভাবে বিদ্যালয়টি চালু রয়েছে।”
থানচি উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান থোয়াই হ্লা মং মারমা বলেন, “দুর্গম প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে উচ্চবিদ্যালয় থাকা উচিত—এই বিবেচনায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলাম। তবে এখন তেমনভাবে সম্পৃক্ত থাকতে পারছি না।”
থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল বলেন, “দুর্গম এলাকার অধিকাংশ শিক্ষার্থী দরিদ্র হওয়ায় বিদ্যালয়ের নিয়মিত আয় নেই। তাই টেকসই সমাধান হিসেবে তিন্দু ও রেমাক্রী এলাকার দুটি বিদ্যালয়কে দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা দেওয়া হয়েছে, যাতে পর্যটক পরিবহনের আয় দিয়ে শিক্ষকদের ন্যূনতম বেতন নিশ্চিত করা যায়।”
তিনি আরও জানান, বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস সংস্কার করা হয়েছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে নতুন ভবন নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকেও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

